অজয়পাড়ের উপকথা - ১৩
সুদীপ ঘোষাল
শ্যামলী বলল, সন্তুদা তোমার তো অভাব ছিল না,বিয়ে হয়েছে।মা বাবা ছিল। তাও তুমি ঘরছাড়া কেন হলে।
সন্তু বলল, সব নিয়তির খেলা।আমার বিয়ের পরে বৃন্দাবনে গেছিলাম। তারপর লাক্ষা দ্বীপও ঘুরেছি। ফোনে বাবা জানিয়েছিলেন, একটি গ্রামের ছেলেকে নিয়ে আমার বউ ঘর ছেড়ে পালিয়েছে কামের তাড়নায়। আর আমি বৃন্দাবনের দেখা মেয়েকে আবার দেখতে গেছিলাম। তার কেউ নেই। আমি তাকে ভালবেসেছিলাম।
সেই আমাকে গেরুয়া পরিধান করিয়েছে।আমাদের প্রেম দেহের উর্ধে। মনের সেতুবন্ধন।রাজু বলল,আমাদের বলুন বৃন্দাবনের কথা।সন্তু শুরু করল বৃন্দাবনের কাহিনীর কথা।দুজনে ভেবে ভেবে ঠিক করলাম বৃন্দাবনে যাবো। রমার সঙ্গে পরিচয় আগে ছিল না। বিবাহসূত্রে পরিচিত হয়েছে। এখনো পরিচয়পর্ব অনেক বাকি আছে। কেউ কাউকে চিনতাম না।
বাড়ি থেকে দেখাশোনা করে বিয়ে দেওয়া হয়েছে।এবার নিজেদের মধ্যে পরিচিতি বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন সময় গল্প-গুজব করি আমরা।সময় কাটাতে আবার কাজের ফাঁকে ফাঁকে বেড়াতে যাওয়ার কথাও চিন্তা করতাম। ঠিক ভেবে ভেবে তাদের সময় পেরিয়ে বৈশাখ মাস থেকে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় শ্রাবণ, ভাদ্র পেরিয়ে আশ্বিন মাস হল। পুজোর ছুটিতে ঠিক করলাম বৃন্দাবনে যাবো।
শুরু হল তোড়জোড়। প্রয়োজনের কিছু জিনিস নিলাম। বাকিটা কিনে নেওয়া যাবে। আমি জানি নগদ টাকা পয়সার সঙ্গে এ টি এম কার্ডটাও রাখতে হবে। কলকাতা থেকে দিল্লি আগ্রা হাইওয়ে ধরে 135 কিলোমিটার দক্ষিনে গেলেই বৃন্দাবন।বৃন্দাবনও মথুরায় মন্দির কমকরে হলেও ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার প্রায়। মন্দিরগুলি যার বেশিরভাগই কৃষ্ণ, রাধা কৃষ্ণ র সঙ্গে কোন না কোন ভাবে সম্পর্কিত।বৃন্দাবনে গিয়ে তারা প্রথমে ঠিক করল বাসা।
একটি লজ পছন্দ হয়েছে। লজের নাম রাধা ভবন।সেই রাধা ভবনে তারা আশ্রয় নিল।ভাড়া মিটিয়ে চাবি নিয়ে ঘরে ঢুকল। এখানে নিরামিষ খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে। রমা ও অনুপের পছন্দের খাবার এখানে আছে। লজের সামনে একটা বেশ সুন্দর রাধাকৃষ্ণের ছবি। আর কৃষ্ণের হাতে বাঁশি। স্বয়ং কৃষ্ণ যেন সাক্ষাৎ দাঁড়িয়ে একদম বাঁশি বাজাচ্ছেন। অনুপ আর রমা খুব সুন্দর ভাবে খাওয়া দাওয়া করার পর দুপুরের দিকে বেরিয়ে পড়ল বৃন্দাবন ঘোরার জন্য।
বেড়াতে এসে তো আর শুয়ে পড়ে সময় কাটানো ভালো লাগে না। তাই ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম একটার পর একটা মন্দিরে মন্দিরের অভাব নেই। এখানে এখানে এসে এখনো মনে হয় যার মনে হয় যেন হাজার বছর আগে থেমে আছে।উত্তরপ্রদেশের এই প্রাচীন ভূখণ্ডটি শহর হয়ে ওঠে।শহরে নেই পাঁচতারা হোটেলের ঝলক।শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত শপিং প্লাজার স্মার্টনেস কিংবা মাল্টিপ্লেক্সের উত্তরাধুনিকতা কিছুই যেন ছুঁয়ে যায়নি ব্রজ ভূমিকে।
সরু গলি কাচা-পাকা রাস্তা সাইকেল রিকশা মলিন স্কুল ইউনিফর্ম পরা দল মন মাতিয়ে চলে।রাস্তায় কেবলই গেরুয়া বসন ধারীর সংকীর্তন ধ্বনি। কেমন লাগছে তোমার রমা।অনুপ বলল।আমার বউ রমা বলল, সব দেখে খুব ভালো লাগছে। দেখো কুমোরপাড়ায় মাটির কারুকাজ।এদের আর কোন আলাদা ইষ্ট নেই, শ্রীকৃষ্ণ চরণের এই ভূমিতে।মাটির তৈরী রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ বিস্ময় জাগায় অনুপের মনে প্রাণে। এখানে একটা দোকানে শ্রীকৃষ্ণের প্রচুর ছবি বিক্রি হচ্ছে।সেই ছবি বিক্রি করছে একজন সুন্দরী মহিলা।
তার বিয়ে হয়নি কি বিধবা বুঝতে পারছে না অনুপ। কেবল তার ডাগর রূপ মনে এক অদ্ভুত সুর তোলে ক্ষণে ক্ষণে। অনুপ ভাবে, ভাগ্যিস মনের রূপ দেখা যায় না চোখে। তা না হলে কত হৃদয় যে ভেঙ্গে যেত মুহূর্ত প্রেমে। সে এতো সুন্দরী যে তাকে তাকে দেখতে মনে হয় অনেক বার। বারবার ঘুরে ফিরে তার দিকে চোখ দিয়ে ফেলছে। স্ত্রী রাগ করে বলছে তুমি ওদিকে বারবার তাকাচ্ছ কেন। কী মনে করবেন উনি। অনুপ কিন্তু দৃষ্টি সংযম করতে পারছে না ।
সুন্দরী মেয়েটি বলল, নিন বাবু দুটো ছবি নিন শ্রীকৃষ্ণের ছবি বাড়িতে থাকা খুব মঙ্গলের। এই ছবি থাকলে কোন বিপদ-আপদ আপনাদের জীবনে নেমে আসবে না। রোজ দুবেলা এই শ্রীকৃষ্ণের ছবিতে ধূপ দেখাবেন। বাতি দেখাবেন। তাহলে দেখবেন কোন বিপদ আপনাকে ছুঁতে পারবে না।আমি বললাম দুটো নয়, আমাদের চারটে ছবি দিন। আমরা চারটে ঘরে চারটে ছবি টাঙিয়ে রাখবো।আর মনে মনে ভাবল তোমার স্মৃতি ও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে।দাও চারটে শ্রীকৃষ্ণের ছবি দাও ।রমা বললো চারটে প্রয়োজন নেই। একটাই নাও।
--- না একটা নিলেই তো হয় না।
---ঠিকমতো ধুপ বাতি দেখালেই তো একটা ফটোতে ভক্তি হবে।
ভক্তি দেখানোর জন্য অত ছবি নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
আমি বললাম,তুমি বাধা দিও না প্লিজ। না চারটিই থাক।আমি সুন্দরী মেয়েটিকে বললাম, আপনাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে পারি?সুন্দরী মেয়েটি বলল হ্যাঁ নিশ্চয়ই পারেন।
- আপনার নাম কি জানতে পারি। মেয়েটি বলল হ্যাঁ নিশ্চয়ই, আমার নাম লেখা।
---আপনি এখানে আপনি এখানে এলেন কি করে।মেয়েটি বলল আমি বিধবা হওয়ার পর এখানে এসেছি।তারপরে আমি নিঃসন্তান। তাই একাই আমি এই ব্যবসা করি আর বৃন্দাবন ধামের প্রসাদ গ্রহণ করি। এই ভাবেই আমার জীবন চলে যায় রাধামাধবের দয়ায়। জয় রাধে জয় রাধে।রমার মনে এইবার মায়া জেগে উঠলো সে বললো আহা এত অল্প বয়সে তুমি বিধবা হয়ে গেছো আমি শুনে খুব দুঃখ পেলাম।জয় রাধে। আমি বললাম এই বৃন্দাবনে বেড়াতে আসার উৎকৃষ্ট সময় কোনটা বলতে পারেন?লেখা বলল, বৃন্দাবনে বেড়াতে আসতে হলে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকে নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে শ্রেষ্ঠ সময়।সে আরও বলল,বৃন্দাবনে গোবিন্দজী মন্দির টি অসাধারণ দেখবেন। দেখবেন পুরোটা লাল পাথরে তৈরি।
প্রায় হাজারখানেক কারিগর নাকি পাঁচ বছর ধরে মূর্তি তৈরি করেন। আমরা শুনেছি তবে এই বিষয়ে একটা কথা বলা ভালো আপনার বিশ্বাস থাক আর না থাক বেড়াতে গিয়ে সমস্ত সন্দেহ সরিয়ে রাখবেন। আপনার সন্দহ জড়িয়ে না থাকাই রাখাই ভালো।রমা এবার বলল আপনাকে দেখে তো শিক্ষিত মনে হচ্ছে আপনি তো অনেক খবর রাখেন লেখা বলল হ্যাঁ আমি নরসিংহ দত্ত কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন করেছি।পড়াশুনা করি বৃন্দাবনের ইতিহাস নিয়ে।
অনেক বই পাবেন বাংলা, হিন্দী বা ইংরাজীতে লেখা। এই বৃন্দাবনের পৌরাণিক ইতিহাস।লেখাও বলল, আমার বরাবরই এই বৃন্দাবন ধামের প্রতি একটা আকর্ষণ ছিল। ঈশ্বর শ্রীকৃষ্ণ যেন আমার সেই আশাই পূর্ণ করে দিয়েছেন। জয় রাধে। আমি বললাম তাহলে আপনার দেবতা কৃষ্ণ। শুধু কৃষ্ণ।আহারে কৃষ্ণ প্রেমের কারণে আপনি এখানে এসেছেন।লেখা বলল, হ্যাঁ ঠিক তাই। ঠিক তাই। ঠিকই ধরেছেন আপনি। এই একটাই দেবতাকে ভজনা করি। তবে শুধু কৃষ্ণ প্রেমের কারণে নয় ভাস্কর্যশিল্পের দিক থেকেও মথুরা অত্যন্ত আকর্ষণীয়।আমি বললাম তাহলে কৃষ্ণ প্রেমই আপনাকেই বৃন্দাবনে টেনে এনেছে।আর তার সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করে।
লেখা বলল হ্যাঁ এটা বলতে পারেন। আমার জীবনে ইচ্ছে ছিল এই শ্রীবৃন্দাবনে এসে শেষ দিন কাটানো। ঈশ্বর যেন সেই আশাই পূর্ণ করলেন। আবার বলল লেখা, তবে শুধু কৃষ্ণ প্রেমের কারণে নয় ভাস্কর শিল্পের দিক থেকেও দেখবেন এই কাছের মথুরা অত্যন্ত আকর্ষণীয়। মিউজিয়ামে প্রায় 2000 বছর আগে বুদ্ধের মূর্তি অপূর্ব সুন্দর দেখবেন।আপনারা থাকুন কিছুদিন এখানে। শুধু পাথরের মূর্তি সংগ্রহ প্রায় 5 হাজারের মত।ভাল লাগবে দেখে।রমা বললো দুদিন দোকান বন্ধ রেখে আমাদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করুন না। আপনাকে নিয়ে দেখলে সব কিছু জানা যাবে। আপনার আর্থিক কোনো ক্ষতি হবে না। আমরা আপনাকে পারিশ্রমিক দিয়ে দেব। লেখা বলল, ঠিক আছে আমার আপত্তি নেই।
আমি আপনাদের এই কৌতুহল মেটাতে রাজি।আমি ভাবলাম, মানুষ অজান্তে খাল কেটে কুমির আনে জীবনে। হয়ত এটাই ভবিতব্য। তারপরের দিন থেকে লেখাকে নিয়ে শুরু হলো মথুরা ভ্রমণ। মথুরা জুড়ে 2525টি ঘাট আছে। বিশ্রাম ঘাটের সৌন্দর্য সবাইকে মুগ্ধ করে। লেখা কথাগুলো বলে চলেছে আমরা শুনে চলেছি। লেখা আরো বলছে, কথিত আছে কংস বধের পরে শ্রীকৃষ্ণদেব এই ঘাটে বিশ্রামে ছিলেন। এই ঘাটে তাকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য মন্দির।বিশ্রাম ঘাটে সন্ধারতি এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
কোন পর্যটক এটা মিস করেন না।লেখা বলল, আমাদের বিয়ের পরও আমরা প্রথম হানিমুনে বৃন্দাবনে এসেছিলাম। আমার মনে পড়ে আমরা ওই লজেই থেকেছি। আপনারাও রাধা ভবনে আছেন। ওই রাধা ভবনে যে আমরাও ছিলাম আজ থেকে পাঁচ বছর আগে। কিন্তু আমাদের বিবাহ জীবন সুখের হলো না।
স্বামী এক পথ দুর্ঘটনায় মারা গেলেন। জয় রাধে। আমার স্বামী ছিলেন কবি,বাউল। সংসারে তার মনযোগ ছিল না। মালিহা গ্রামে তাদের বাড়ি ছিল। খুব আনন্দে থাকত আমার স্বামী। সে আমাকে তার জীবনের গল্প বলেছিল। স্বামীর নাম ছিল সন্তু। আসুন আমরা বিশ্রামঘাটে বসে তার গল্প বলি। কানি নদীর পাড়ে মালিহা গ্রাম। হারুদাদু বলতেন,এই গ্রামে পাঁচশো বছর আগে এক রাজা এসে বড় অট্টালিকা করেছিলেন এক সুন্দরীকে ভালোবেসে।সেইসব আর নাই।কালের প্রবাহে ভেসে গেছে।গ্রামে দুইশত পরিবারের বাস।বেশিরভাগই মাটির বাড়ি।স্বামীর মাটির বাড়ি।
চারচালা টিনের চাল। টাকা গ্রামে মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। সামান্য কটা টাকা আছে। সে জানে মাস চালাতে হবে। রাত বেশি হওয়ায় দোকানগুলো বন্ধ। একগ্লাস জল ঢকঢক করে পান করলো। অমৃতের স্বাদ। কিন্তু পোড়া পেট মানে না বারণ। চুঁই চুঁই করছে। তবু লেপ মুরি দিয়ে শুয়ে পরলো। গুরুর জপ শেষ করে ঘুমোয় সে। জপ করার সময় শুনতে পেলো ঠক ঠক আওয়াজ। তাড়াতাড়ি জপ শেষ করে বললো,কে?
--আমি, দরজাটা খুলুন।
--জগতে সবাই তো আমি। নাম বলুন।
--আমি পাপিয়া,আপনার বাড়িওলার একমাত্র মেয়ে।
---এত রাতে কেন? কি প্রয়োজন বল?
----আরে খুলুন না ছাই।
দরজা খুলে দেখলো বাড়িওয়ালার সুন্দরী অষ্টাদশী মেয়েটা। হাতে একটা বাটি। বললো,আজকে আমাদের সত্যনারায়ণ পুজো ছিলো, মা তাই প্রসাদ পাঠালেন। খেয়ে জল খাবেন। প্রসাদ খেয়ে জল খেতে হয়। জল খাবেন। এখন কি ঢাকা দিয়ে রেখে দেব।সন্তু বলল,তাই দাও। আমি পরে খেয়ে নেব।পাপিয়া বলল, আমি বসব। আপনার সঙ্গে গল্প করব।
- কিন্তু মেসোমশাই রাগ করবেন। রাতে গল্প।
-- বকবে না। বাবাকে বলে, তারপর এসেছি। বলেছি সন্তুদা প্রসাদ খাবে। তারপর বাটি নিয়ে আসতে দেরী হবে।
--- কত আর দেরী হবে খেতে।
--- কিচ্ছু বলবে না, বলছি না। বাবা আমাকে বকে না। একমাত্র আদরের মেয়ে আমি। পাপিয়া বলল, এবার তোমার গ্রামের গল্প বলো। আমি কিন্তু তোমাকে, তুমি তুমি বলব সন্তুদা। তুমি বেশে কথা বল না কেন? কথা বলবে এখন। আমি শুনব।
.png)
DS.png)
.png)