মুহাম্মদ সেলিম রেজা
চুলকানির সুখ উপভোগ করেনি এমন লোক পৃথিবীতে নেই। তেমনি অতি উৎসাহে চুলকাতে গিয়ে ক্ষতের সৃষ্টি করে ফ্যাসাদে পড়েছেন এমন লোকের সংখ্যাও খুব কম নয়। প্রশ্ন হল চুলকাতে গিয়ে ক্ষত তৈরী হয় জেনেও কেন মানুষ চুলকায়?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে জেনে নেওয়া দরকার চুলকানি কত প্রকারের হয় ও কি কি? উপসর্গ বিশেষে এই অসুখকে চর্মরোগজনিত ও মানসিক, দুইভাগে ভাগ করা যায়। এখন আপনারা বলতেই পারেন মানসিক চুলকানি আবার কী! এমন রোগের কথা তো কোনদিন শুনিনি? হয়তো শোনেননি, কিন্তু মানসিক চুলকানিতে আক্রান্ত রোগী কমবেশি সকলেই দেখেছেন একথা আমি হলফ করে বলতে পারি।
যাক এই নিয়ে পরে আলোচনা হবে। তার আগে চিরায়ত চর্মরোগজনিত চুলকানির নিয়ে একটু চর্চা করে নেওয়া যাক। শরীরবৃত্তিয় কারণে শরীরের নির্দিষ্ট অঙ্গে উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং ক্রমাগত সুড়সুড় করতে থাকে। যতক্ষণ না সেই বিশেষ জায়গাটি আঙুল দিয়ে উসকে দেওয়া না হয় চিড়বিড়ানি বাড়তেই থাকে। যেমন চুলের গোড়া, হাতের চেটো, পায়ের পাতা, দুই জঙ্ঘার মধ্যবর্তী স্থানের চুলকানি। এতে করে মানুষ কমবেশি বিরক্তবোধ করলেও আহামরি অস্বস্তিতে ভোগে না। সমস্যা হয় দাদ-হাঁজা-পাঁচড়ার মতো জিদ্দি রোগে আক্রান্ত হলে।
আবার এলার্জি (আমবাত) নামক একটি ব্যধিতে কিছু মানুষ ভোগে। এই রোগের বিশেষত্ব হল হঠাৎ করে শরীরের কোন জায়গা ফুলে ওঠে এবং চুলকাতে থাকে। নিঃশ্বাসের সাথে ধুলোবালি, ফুলের রেণু ইত্যাদি শরীরে প্রবেশ করলে কেউ কেউ এই রোগে আক্রান্ত হয়। কারও কারও চিড়িংমাছ, মসুর ডাল কিংবা বিশেষ কোন ঔষধে এ্যালার্জি আছে।
যাইহোক চুলকানির নেতিবাচক দিক হল কোনরকম পূর্বাভাস ছাড়া প্রাদূর্ভাব ঘটে। আর আক্রান্ত হলে স্থান-কাল-পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার সময় হাতে থাকে না। চুলকাতে গিয়ে মুখে চুনকালি লেপনে সমূহ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিরত থাকা যায় না। মনে করুন আপনি একজন নৃত্যশিল্পী। স্টেজে পারফর্ম করছেন। শত শত মানুষ দর্শকাসনে উপবিষ্ট, আপনার প্রত্যেকটি মুভমেন্ট তার গোগ্রাসে গিলছে। এমনসময় আপনার পশ্চাদ্দেশে সুড়সুড়ি ওঠে তাহলে পরিস্থিতি কেমন দাঁড়াবে? নিঃসন্দেহে লজ্জাজনক। আপনি আপ্রাণ চেষ্টা করবেন পশ্চাদ্দেশে হাত না দেবার। কিন্তু চুলকানি এমনই বজ্জাত ব্যমো হাতবাবাজিকে ঠিক টেনে নেবে।
যেমনটা হয়েছিল আমাদের সদানন্দ সমাদ্দারের বেলায়। বেচারা নতুন বিয়ে করে অষ্টমঙ্গলায় শ্বশুরবাড়ি গেছে। শালীদের মাঝে নবাবী কেতায় বসে তাত উপভোগ করছে। এমনসময় তার পুরুষযন্ত্রের নিম্নাংশ চিড়চিড় করে উঠল। হাতবাবাজি কখন সপ্রণোদিত হয়ে চুলকাতে শুরু করেছে সে জানতেও পারেনি। গিন্নি ইশারা করলে চেতনা ফিরে পেল ততক্ষণে শালীরা ঘর ছেড়ে পালিয়েছে। বেচারা সদানন্দ লজ্জায় সেদিন আর তাদের মুখোমুখি হতে পারেনি।
মন্দের ভালো চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতিতে শরীরবৃত্তীয় চুলকানি অনেকাংশে প্রতিহত করা সম্ভব। কিন্তু মানসিক চুলকানি প্রতিহত করার ঔষধ আজ পযর্ন্ত আবিষ্কার হয়নি। আপনার পার্শ্ববর্তী এলাকায় খোঁজখবর করলে এমন অনেক ছেলের সন্ধান পাবেন যারা লেখাপড়া শিখে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারীর আসন অলংকৃত করছে। বিয়ে করেছে কোটিপতি ঘরের মেয়েকে। এখন সে গরীব বাপের পরিচয়ে পরিচিত হতে লজ্জাবোধ করে। আমি অমুকের জামাই পরিচয় দিয়ে পরিতৃপ্তির ঢেকুর তোলে। যত শিক্ষিত ও উচ্চপদাধিকারী হোক না কেন তারা যে মানসিক বিকার গ্রস্থ এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে কী?
চোখকান খোলা রাখলে পাড়া-প্রতিবেশীর মাঝে এমন কিছু মহামানবের সন্ধান পাওয়া যাবে যারা কথায় কথায় জমি-জায়গা, ধন-সম্পদের অহং প্রকাশ করে থাকে। ভাবখানা এমন যেন সম্পত্তি-টাকা করে সবার মাথা কিনে নিয়েছে। ব্যাটারা বুঝতে চায় না অর্জিত সম্পত্তির একটি কানাকড়িও যখন কাউকে দিবি না তখন তোর গরম দেখবে কে? পাশাপাশি এমন কিছু মানুষ আছে যাদের অর্থ-সম্পদ বলার মতো না থাকা সত্ত্বেও এমন ভান করে যেন বিল গেটসের নাতি।
কিছু মানুষ আবার নিজেকে জাহির করার চুলকানিতে ভোগে। এই প্রসঙ্গে একজনের কথা মনে পরে গেল। সেদিন বাসে করে ফিরছিলাম রঘুনাথগঞ্জ থেকে। পরিচিত এক ভদ্রলোক ওমরপুর বাস স্টপেজে উঠে আমাকে দেখে প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, সেলিম একটা খবর পেয়েছে?
আমি নেতিবাচক ইঙ্গিত করলে তিনি আবারও বললেন, বাড়া মুসকিলে পড়েছি ভাই।
কী হয়েছে জানতে চাওয়া হলে তিনি যা বললেন, এমন কথা শোনার জন্য আমি কেন বাসের কোনযাত্রী প্রস্তুত ছিলেন না। কোন গ্রাহকের টাকা ব্যাঙ্ক নিতে চাইছে না এমন ঘটনার কথা আজ পর্যন্ত শোনা যায়নি। আম্বানি-আদানি থেকে শুরু করে বিশ্বের তাবড় তাবড় ধনকুবেরের টাকা ব্যাঙ্ক ব্যবস্থার মাধ্যমে লেনদেন হয়। আর উনি বলেন কিনা জামাইয়ের এতো টাকা হয়েছে যে কোন ব্যঙ্ক নিতে চাইছে না। যেখানে তাঁর জামাই একজন মধ্যমানের সরকারি চাকুরে।
যাইহোক শেষপর্যন্ত ভদ্রলোকের জামাই টাকা কি করেছিলেন জানা যায়নি। কিন্তু সেদিন ভদ্রলোককে যে পরিমান ট্রোলের শিকার হতে হয়েছিলেন, কহতব্য নয়। ভেবেছিলাম উনি শুধরে যাবেন। সে গুড়ে বালি! স্বভাব যায় মরলে, ইল্লত যায় না ধুলে। এইশ্রেণির মানুষেরা জীবনেও অতিকথন ব্যধি মুক্ত হতে পারে না।
লেখালেখির সুবাদে মাঝেমধ্যে সাহিত্য সভায় যেতে হয়। একটা বিষয় লক্ষ্য করেছি অনেক কবি পাঠ করতে উঠে সগর্বে ঘোষণা করেন, কবিতাটি এখানে বসে লিখলাম। লিখতে পারেন তখন অবশ্যই লিখবেন। ঘর-বারান্দা, মাঠ-ঘাট, টয়লেট-বাথরুম, যেখানে খুশি বসে লিখুন। কবিতা ভালো হলে গবেষকরা আপনাকে খুঁজে বেড়াবে। নিজ মুখে বলতে হবে কেন? অনেকে আবার একটি কবিতা পাঠ করে তৃপ্ত হন না। কর্তৃপক্ষ অনুরোধ করা সত্ত্বেও একাধিক কবিতা পাঠ করতে থাকেন। ভুলে যান সময় সীমিত, অন্যরা লাইনে রয়েছে।
তেমনি রাজনীতির লোকেরা ক্ষমতার চুলকানিতে ভোগে। নির্বাচনে জিতে ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। জনতার উপর প্রভুত্ব করতে চান। মেয়াদ শেষে ওই জনতার দরবারে ঝুলি হাতে দাঁড়াতে হবে সে কথা তাদের মনে থাকে না। বউমারা শ্বাশুরির সাথে অবিচার করার সময় ভাবে না একসময় সেও শ্বাশুরি হবে। বাবা-মায়ের দায়িত্ব বহন করতে অস্বিকার করার বেলায় ছেলেরা ভাবে না একদিন তারাও পাল্টা পেতে পারে।
যাইহোক সেরার সেরা চুলকানি হল ‘বাহবা পাবার লোভ’। এদের কোন কাজেই আন্তরিকতা থাকে না। শুধু লোকে বাহবা দেবে এই আশায় সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে থাকে। একবার যদি কাউকে এই ব্যধিতে ধরে সর্বশ্রান্ত না পর্যন্ত তার নিস্তার নেই। অতএব সাধু সাবধান! লোভের মাত্রা যেন কখনই সীমা লঙ্ঘন না করে যায়।
