যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

হোসেইন আহমদ চৌধুরী

 



প্রসঙ্গ: সাহিত্যে নগ্নতা // হোসেইন আহমদ চৌধুরী


বুকে হিম্মত রেখে বলছি, সদুত্তর দিতে সদা প্রস্তুত। তাই বলে অবান্তর প্রশ্ন করে বিব্রত করোনা, নিজেই ঠকবে। অনেকেই কবি সম্বোধন করে করে সাহসী করে তুলেছেন, তাই ভাবতে হয় প্রচুর, পড়তেও হয় অনেক। সাহসী হলেও লেখালেখিতে অসভ্যতার দোষে দোষী সাব্যস্ত হতে রাজি নই। এ ধৃষ্টতা দেখাবো না।
নতুন লেখিয়েরা আল মাহমুদের একটি কথা মুখে মুখে বলে থাকেন, ” অযু করে সাহিত্যচর্চা হয়না, আবার নগ্নতা কোনো সাহিত্য হতে পারেনা “। এখানে আমার কথা হলো, আপনি মাছ ধরবেন কিন্তু জল ছোঁবেন না, তা তো হবার নয়। এরকম মনোভাব পোষণ করে আপনি কতোটুকু সফলকাম হবেন, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। সাহিত্যে নতুন গতি আনতে হলে আপনাকে শক্তি সঞ্চার করতে হবে। এই শক্তি শব্দের শক্তি, বাহারি শব্দের শক্তি। বাহারি শব্দে বাক্যকে সাজাতে হবে।
শব্দ ও বাক্যকে ব্রহ্মের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, ” শব্দ ব্রহ্ম ” ” বাক্য ব্রহ্ম “। শব্দ সাজিয়ে বাক্য গঠন করে রচিত হয়েছে ধর্মগ্রন্থ, তন্ত্রমন্ত্র, প্রার্থনাবাক্য এমন কি অভিশাপ বাক্যও।
আপনি ভোজন রসিক। আপনার সামনে নানান ধরনের দামি খাবারের সম্ভার। কিন্তু খেতে বসে দেখলেন রান্না যাচ্ছেতাই। আপনাকে তখন ক্ষুধার্ত পেটেই উঠতে হবে। রান্নার গুণে ডাল- ভর্তাও উপাদেয় খাবারের মর্যাদা পেতে বাধ্য।
আপনি ইমারত নির্মাণ করবেন। আপনার চাই ইট, পাথর, বালু, রড, সিমেন্টসহ আনুসঙ্গিক জিনিসপত্র। সাহিত্য সৃষ্টিতেও চাই বিভিন্ন উপকরণ। ধরে নিন, ইমারতের জন্য যেমন ইট, সাহিত্যের জন্য তেমন শব্দ। বাঁকাত্যাড়া ইটের তৈরি ইমারত যেমন নিখুঁত হয়না তেমনি উপযুক্ত শব্দের গাঁথুনি ছাড়া মানসম্পন্ন সাহিত্য নির্মাণ সম্ভব নয়।
সাহিত্যে নগ্নতা বলে কিছু নেই, অসভ্যতা বলে কিছু নেই, বিশেষ করে কাব্যসাহিত্যে। তবে কাজটি করতে হবে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে। ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠতম সুন্দর সৃষ্টি হলো মানুষ আর মানুষের মধ্যে আশ্চর্যজনক সৃষ্টি নারী। কবি সাহিত্যিকরা নারীকে প্রতিমার সাথে অহরহ তুলনা করে থাকেন। আপনার সুন্দরী স্ত্রীকে আপনি বিবস্ত্রা অবস্থায় কোথাও নিয়ে যাবেন না নিশ্চয়। সুন্দর শাড়ি কিংবা আকর্ষণীয় পোশাকে আচ্ছাদিত করেই নিয়ে যাবেন। ঠিক তেমনি আপনার লেখাকে নগ্নতার অপবাদ মুক্ত করবেন বাহারি শব্দের কারিশমায়, আচ্ছাদনে আচ্ছাদিত করে।
একদল সাহিত্যবোদ্ধা নির্দ্বিধায় বলে বেড়াচ্ছেন, ” এখন আর রবীন্দ্রনাথ নজরুল নেই যে, আপন লেখায় নতুন এক গতি নিয়ে আসবেন “। তাঁদের এ কথায় একদল কবি সাহিত্যিক সাহিত্যকে গণ্ডিবদ্ধ করে চর্চা করে যাচ্ছেন। তাঁদের জ্ঞাতার্থে আবুল হাসান এর ” প্রাচীন বসতি ছেড়ে নতুন বসতি ” কবিতাটির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।
” রবীন্দ্রনাথের পরে আরো একদল
রবীন্দ্রনাথ এসেছিলো,
তারপর আরো একদল।
যেমন নদীর পরে নদী,
যেমন ফুলের পরে ফুল।
প্রাচীন দালান ভেঙ্গে নতুন দালান
প্রাচীন বসতি ছেড়ে নতুন বসতি
যেভাবে এক রবীন্দ্রনাথকে ছেড়ে পুনরায়
অন্য রবীন্দ্রনাথের দিকে আমরা এগোই।
আবু হাসান শাহরিয়ার বলেছেন, ” কবিরা গড়িয়ে যেতে আসেনা, হারিয়ে যেতে আসে “। আবু হাসান শাহরিয়ারের উক্তির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে বলছি, কবিতা একটি সাজানো শিল্প। এ শিল্পের শিল্পীর থাকতে হবে একটি সৃজনশীল মন আর মগজের তীক্ষ্ণতা এবং শব্দ সাজানোর অপার দক্ষতা।
কবিরা গড়িয়ে নয়, হারিয়ে যায়। হারিয়ে যাওয়া এক অর্থে মরে যাওয়া। কবি সাহিত্যিকদেরকে বেঁচে থাকতে হবে। বেঁচে থাকতে হবে মানুষের মাঝে, মানুষের মনে। রবীন্দ্রনাথ বারবার বলেছেন –
” মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে
মানুষের মাঝে আমি বাঁচিবার চাই ”
রবীন্দ্রনাথ অন্যত্র বলেছেন – ” খাদ্যের অভাবে মানুষ মরে না কিন্তু আনন্দের অভাবে মানুষের মৃত্যু ঘটে “।
বাঁচুন আনন্দের সাথে, লিখুন আনন্দের সাথে। সে নগ্নতাই হোক আর যাই হোক। তবে তা যেনো হয় বাহারি শব্দে, মাধুর্যপূর্ণ ভাষায় নগ্নতাকে শব্দের আচ্ছাদনে আচ্ছাদিত করে।

Post a Comment

ধন্যবাদ । শুভেচ্ছা ।
© Web to Story - Site. All rights reserved. Developed by Jago Desain