যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

আমি ননীবালা - শম্পা সাহা

 


আমি ননীবালা

শম্পা সাহা
“আমি যে ভাষায় হগলটা কইতে চাইছিলাম তা আপনেগো বোধগম্য হইবো না ।তাই এক জনরে দিয়া লিখাইয়া নিলাম। হয়তো হেয় আমার ভাবনা চিন্তা ভালভাবে পকাশ করতে পারবো না। কিন্তু কি করুম ?আমার ভাষা হগ্গলে নাও বোঝতে পারে ।তাই এই উপায় লইলাম।”
আমি ননীবালা ।ঠিক কবে জন্মেছি সে সালটাল আর আমার মনে নেই।আমাদের সময় অত সাল তারিখ কেউ মনে রাখত না। তার উপরে আবার আমি মেয়ে মানুষ !এত খেয়াল কে রাখে? তবে এটুকু মনে আছে যে, দেশভাগের সময় আমি বেশ খানিকটা বড় ।মানে যখন দেশ স্বাধীন হলো, তেরঙ্গা পতাকা উড়লো প্রথম স্বাধীন ভারতে তখন আমি কিশোরী। এখন তাহলে আমার বয়স দাঁড়ায় চার কুড়ির বেশি। সংখ্যা টংখ্যা ঠিক বলতে পারব না ।কারণ আমাদের সময় মেয়েদের পড়াশোনার চল একেবারে যে ছিল না তা নয়, তবে আমাদের গ্রামে গঞ্জে পড়াশুনো শেখাটা সাধারণ পরিবারে খুব একটা ভালো চোখে দেখা হতো না । তাছাড়া মেয়েরা বড় হবে, বিয়ে হয়ে শশুরবাড়ী যাবে, ঘরকন্না করবে, বাচ্চা বিয়োবে, স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সেবা করবে।এই ছিল রীতি। এখন যেমন শুনি,তখন অত বেশি মেয়েদের রমরমা ছিল না!
তবে মেয়েরা যে খুব কষ্টে ছিল এমনও বলতে পারি না ।কারণ তখন মেয়েদের যা কাজ বলে ঠিক ছিল, তা মেয়েরা তাদের কাজ বলেই মনে করত। তাই তা করে তাদের অসম্মান হয় এটা ভাবার কোনো সুযোগ ছিল না ।বরং মা ঠাকুমাদের দেখতাম ভোরবেলা উঠে উঠোন নিকোনো, রান্না চাপানো, ঢেঁকিতে ধান ভানা,চিড়ে বানানো, ধান সেদ্ধ করা, গরুর দেখাশোনা করা বা দাদু,বাবা,জ্যাঠা, কাকাদের সেবা করাই একমাত্র কাজ বলে মনে করতো।এ নিয়ে তাদের কোনো খেদ বা গ্লানি ছিল বলে মনে হয়নি কখনো।
দাদু গলা খাঁকারি দিলেই, মা এক গলা ঘোমটা দিয়ে হাতের কাছে প্রয়োজনীয় জিনিস এগিয়ে দিতো। মুখে বলতেও হতো না কি চাই! আর ঠাকুমা একটা পিঁড়ের ওপর বসে তদারকি করত সবকিছু। বাড়িতে ছেলেদের মুখের কথা খসবার আগেই তাদের হাতের কাছে সব হাজির!
ঝিনাইদহে ছিল আমাদের বাড়ি। সামনে দিয়ে একটি ছোট নালা মতন চলে গেছে ।ওখানে আমরা চান করতাম,সাঁতার দিতাম। নালা হলে কি হয়? বেশ জল! মাছ পাওয়া যেত। গামছা দিয়ে ছোট ছোট মাছ ধরতাম ভাইদের সঙ্গে ।বাড়ি এসে বকাও খেতাম ।সাত ভাই বোনের মধ্যে আমি বড় তারপরে আরো দুই বোন, চার ভাই। কাকা জ্যাঠা মিলে তা প্রায় কুড়ি বাইশজন তো হবেই!
বিরাট উঠোনের তিন দিকে টানা সারি সারি ঘর। বেড়া, টিন আর টালি। মেঝেটা অবশ্য মাটির কিন্তু নিকোনো।শুধু ঠাকুরমা দাদুর ঘরে ছিল লাল সিমেন্টের মেঝে।বিরাট রান্নাঘর‌। একপাশে বড় বড় উনুন,দুমুখো আর তারই পাশে ছোট তোলা উনুন। তখন তো আর রুটি খাওয়ার চল ছিলনা। সাধারণত মাটির উনুন দুটো একসাথে ব্যবহার করা হলেও যখন কোন অনুষ্ঠান টনুষ্ঠান হতো তোলা উনুন গুলো তখনকার জন্য।
আমরা সব ভাইবোনরাই বাড়িতে হই ।আমার ছোট ভাইটা বা খুড়তুতো ভাই বোনদের হবার সময় দেখেছি ।দাই এসেছে, আঁতুরের ভেতর থেকে কাকির চিৎকার শোনা যাচ্ছে, জেঠিমা,মা গরম জল, ন্যাকড়া, কয়লার আগুন করে দিচ্ছে, আর বাশের চাঁচ ,নাড়ি কাটবে বলে। তার কিছুক্ষণ পরেই শোনা যেত কান্নার আওয়াজ। “প্যাঁ……”।রাজু দাইয়ের হাত খুব ভালো। আমাদের গ্রামে, রাজুর হাতে হওয়া পোয়াতিদের কোল কোনোদিন খালি হয়নি।ওর এমন পয়! তাই ভিন্ গাঁ থেকেও কারো প্রসব যন্ত্রনা উঠলে ওকে বেশি পয়সা,একটার বদলে দুখানা শাড়ি দিয়ে নিয়ে যেত।কিন্তু রাজুর নিজের কোলই ছিল খালি। সে যাক গে।
ক্রমশঃ…

Post a Comment

ধন্যবাদ । শুভেচ্ছা ।
© Web to Story - Site. All rights reserved. Developed by Jago Desain